তাওহীদ (আল্লাহর এককত্ব)

প্রশ্ন: রুবুবিয়্যাহ বা রব হিসেবে আল্লাহর এককত্ব বলতে কী বুঝায়?

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য।

তাওহিদে রুবুবিয়্যাহ: অর্থাৎ আল্লাহর যাবতীয় কর্মে তাঁকে এক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া। যেমন- সৃষ্টি করা, মালিকানা (সার্বভৌমত্ব), নিয়ন্ত্রণ করা, রিযিক দেয়া, জীবন দেয়া, মৃত্যু দেয়া, বৃষ্টিপাত করা ইত্যাদি। সুতরাং আল্লাহকে সবকিছুর রব, মালিক, সৃষ্টিকর্তা ও রিযিকদাতা হিসেবে স্বীকৃতি না দিলে; জীবন ও মৃত্যুদাতা, উপকার ও ক্ষতিকারী, দুআ কবুলকারী, সবকিছুর নিয়ন্ত্রণকারী, সকল কল্যাণের অধিপতি, স্ব-ইচ্ছা বাস্তবায়নে ক্ষমতাবান হিসেবে বিশ্বাস না করলে একত্ববাদের ঈমান পরিপূর্ণ হবে না। এর মধ্যে তাকদীর তথা ভাল-মন্দ আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত এ ঈমানও অন্তর্ভুক্ত।

এ প্রকারের তাওহিদের ক্ষেত্রে মক্কার কাফেরগণ আপত্তি করেনি; যাদের কাছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রেরিত হয়েছিলেন। বরং তারা সামষ্টিক বিচারে তাওহিদে রুবুবিয়্যাতে স্বীকৃতি দিত। আল্লাহ তাআলা বলেন: “আপনি যদি তাদেরকে জিজ্ঞাসা করেন কে নভোমণ্ডল ও ভূ-মণ্ডল সৃষ্টি করেছে? তারা অবশ্যই বলবে, এগুলো সৃষ্টি করেছেন পরাক্রমশালী সর্বজ্ঞ আল্লাহ।”[সূরা যুখরুফ, আয়াত: ০৯] তারা স্বীকার করত যে, আল্লাহই সবকিছুর নিয়ন্ত্রণকারী। তাঁর হাতে রয়েছে আসমান ও জমিনের রাজত্ব। এর থেকে জানা গেল যে, আল্লাহর রুবুবিয়্যাতের এতটুকু স্বীকৃতি ইসলাম গ্রহণের জন্য যথেষ্ট নয়। বরং এ ঈমান অন্য যে ঈমানকে আবশ্যক করে সে অংশের উপরও ঈমান আনতে হবে। সেটা হচ্ছে উলুহি্য়্যাত তথা উপাসনাতে আল্লাহর এককত্বের প্রতি ঈমান।

এ তাওহিদ অর্থাৎ তাওহিদে রুবুবিয়্যাকে বনি আদমের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কেউ অস্বীকার করেছে বলে জানা যায় না। এ কথা কেউ বলেনি যে, এ মহাবিশ্বের সমমর্যাদার অধিকারী একাধিক স্রষ্টা রয়েছে। তাই রুবুবিয়্যাকে কেউ অস্বীকার করেনি। শুধু অহংকার ও হঠকারিতা বশতঃ ফেরাউনের পক্ষ থেকে এ ধরনের অস্বীকৃতি প্রকাশ পেয়েছে। বরং সে দাবী করেছিল সেই রব্ব। আল্লাহ তাআলা তার কথাটি উদ্ধৃত করে বলেন: “এবং বললঃ আমিই তোমাদের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর রব্ব।”[সূরা নাযিআত, আয়াত: ২৪]  “আমি জানি না যে, আমি ব্যতীত তোমাদের কোন উপাস্য আছে।”[সূরা কাসাস, আয়াত: ৩৮] এটি ছিল তার দাম্ভিকতা। কারণ সে জানত সে রব্ব নয়। যেমনটি আল্লাহ তাআলা বলেছেন: “তারা অন্যায় ও ঔদ্ধত্যভরে নিদর্শনগুলোকে প্রত্যাখ্যান করল যদিও তাদের অন্তর এগুলোকে সত্য বলে বিশ্বাস করেছিল।”[সূরা নামল, আয়াত: ১৪] আল্লাহ তাআলা মূসার বিতর্কের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন: “তুমি জান যে,আসমান ও যমীনের রব্ব ছাড়া অন্য কেউ এসব নিদর্শনাবলী নাযিল করেননি।”[সূরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ১০২] তাই সে মনে মনে স্বীকার করত যে, রব্ব হচ্ছেন- আল্লাহ তাআলা।

রুবুবিয়্যাহকে শিরকের মাধ্যমে অস্বীকার করে- মাজুস বা অগ্নি উপাসকেরা। তারা বলে, এ মহাবিশ্বের স্রষ্টা দুইজন: অন্ধকার ও আলো। তবে এ বিশ্বাস সত্ত্বেও তারা এ দুই স্রষ্টাকে সমান মর্যাদা দেয়নি। তারা বলেছে: আলো আঁধারের চেয়ে উত্তম। কারণ আলো কল্যাণের স্রষ্টা। আর আঁধার অকল্যাণের স্রষ্টা। যে কল্যাণ সৃষ্টি করে সে অকল্যাণ সৃষ্টিকারীর চেয়ে উত্তম। অন্ধকার হচ্ছে- অনস্তিত্ব, অনুজ্জ্বল। আলো হচ্ছে- অস্তিত্বশীল ও উজ্জ্বল। তাই আলোর সত্তা অধিক পরিপূর্ণ।

মুশরিকদের রুবুবিয়্যতে বিশ্বাস করার অর্থ এই নয় যে, তাদের সে বিশ্বাস পরিপূর্ণ ছিল। বরং তারা মোটের উপর রুবুবিয়্যতে বিশ্বাসী ছিল। যেমনটি ইতিপূর্বে উল্লেখিত আয়াতগুলোতে আমরা দেখেছি। কিন্তু তারা এমন কিছু বিষয়ে লিপ্ত হতো যেগুলো রুবুবিয়্যতের বিশ্বাসকে ত্রুটিপূর্ণ করে দেয়। যেমন- বৃষ্টি বর্ষণকে নক্ষত্রের সাথে সম্পৃক্ত করা; গণক ও যাদুকরেরা গায়েব জানে বলে বিশ্বাস করা; ইত্যাদি। কিন্তু উলুহিয়্যাতের শিরকের তুলনায় তাদের রুবুবিয়্যাতের শিরক ছিল খুবই সীমাবদ্ধ।

আমরা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছি তিনি যেন মৃত্যু অবধি আমাদেরকে তাঁর দ্বীনের উপর অবিচল রাখেন।

আল্লাহই ভাল জানেন।

দেখুন: তাইসীরুল আযিযিল হামিদ, পৃষ্ঠা-৩৩, আল-কাওলুল মুফিদ (১/১৪)।

পবিত্রতা

চামড়ার মোজা বা কাপড়ের মোজার উপর মাসেহ করার পদ্ধতি

আলহামদুলিল্লাহ।

চামড়ার মোজা কিংবা কাপড়ের মোজার ওপর মাসেহ করার সময়কাল শুরু হয় প্রথমবার ওযু ভাঙ্গার পর প্রথমবার মাসেহ করা থেকে। প্রথমবার মোজা পরিধানের সময় থেকে নয়।

মাসেহ করার পদ্ধতি:

দুই হাতের ভেজা আঙ্গুলগুলো দুই পায়ের আঙ্গুলের ওপর রাখবে। এরপর হাত দুইটি পায়ের গোছার দিকে টেনে আনবে। ডান পা ডান হাত দিয়ে মাসেহ করবে; বাম পা বাম হাত দিয়ে মাসেহ করবে। মাসেহ করার সময় হাতের আঙ্গুলগুলো ফাঁকা ফাঁকা করে রাখবে। একাধিকবার মাসেহ করবে না।[দেখুন: শাইখ ফাউযানের ‘আল-মুলাখ্‌খাস আল-ফিকহি ১/৪৩]

শাইখ উছাইমীন (রহঃ) বলেন: অর্থাৎ মোজার যে অংশ মাসেহ করা হবে সেটা উপরের অংশ। শুধু পায়ের আঙ্গুলের দিক থেকে পায়ের গোছার দিকে হাত টেনে আনবে। একত্রে দুই হাত দিয়ে দুই পা মাসেহ করবে। অর্থাৎ ডান হাত দিয়ে ডান পা মাসেহ করবে এবং একই সময়ে বাম হাত দিয়ে বাম পা মাসেহ করবে। যেমনটি দুই কান মাসেহ করার ক্ষেত্রেও করা হয়। কেননা সুন্নাহ থেকে বাহ্যিকভাবে এটাই জানা যায়। দলিল হল মুগিরা বিন শুবা (রাঃ) এর উক্তি: “তিনি দুই পায়ের ওপর মাসেহ করেছেন”।  তিনি এ কথা বলেননি যে, ডান পা দিয়ে শুরু করেছেন। বরং বলেছেন: “দুই পায়ের ওপর মাসেহ করেছেন”। এ কারণে সুন্নাহ থেকে বাহ্যিকভাবে এটাই জানা যায়। হ্যাঁ, যদি এমন হয় যে, তার এক হাত কাজ করে না সেক্ষেত্রে সে বাম পায়ের আগে ডান পা মাসেহ করে তাহলে ঠিক আছে। অনেক মানুষ দুই হাত দিয়ে ডান পা মাসেহ করে এবং দুই হাত দিয়ে বাম পা মাসেহ করে— এর কোন ভিত্তি নেই। তবে ব্যক্তি মোজার উপরের অংশ যেভাবেই মাসেহ করুক না কেন সেটা জায়েয হবে। আমরা এখানে যেটা আলোচনা করেছি সেটা হচ্ছে উত্তম পদ্ধতি কোনটি সে সম্পর্কে।[সমাপ্ত]

[দেখুন: ফাতাওয়াল মারআ আল-মুসলিম ১/২৫০]

মোজার দুই পার্শ্ব কিংবা পেছনের অংশ মাসেহ করবে না। যেহেতু এ বিষয়ে কোন দলিল নেই। শাইখ উছাইমীন বলেন: “কেউ হয়ত বলতে পারে যে, বাহ্যিক দৃষ্টিতে মোজার ওপরের অংশ মাসেহ করার চেয়ে নীচের অংশ মাসেহ করা অধিক যুক্তিযুক্ত। কারণ নীচের অংশে মাটি ও ময়লা লাগে। কিন্তু, আমরা চিন্তাভাবনা করে পেয়েছি মোজার ওপরের অংশ মাসেহ করা অধিক যুক্তিযুক্ত এবং বিবেক-বুদ্ধিসম্মত। কারণ এ মাসেহ দ্বারা পরিষ্কার করা বা নির্মল করা উদ্দেশ্য নয়। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে একটি ইবাদত পালন করা। যদি আমরা মোজার নীচের অংশ মাসেহ করতাম তাহলে তো মোজা আরও বেশি ময়লা হয়ে যেত। আল্লাহই ভাল জানেন।

[দেখুন ‘আল-শারহুল মুমতি ১/২১৩]

পেশাব করার পর নিজের পোশাকের পবিত্রতার ব্যাপারে সন্দেহ হচ্ছে

আলহামদুলিল্লাহ।

সুন্নত হচ্ছে- বসে পেশাব করা। যদি কেউ দাঁড়িয়ে পেশাব করে তাতে কোন অসুবিধা নেই; যদি সে ব্যক্তি কাপড় ও পোশাককে নাপাকি থেকে বাঁচাতে পারে।

যদি কেউ দাঁড়িয়ে পেশাব করার পর নিশ্চিত হয় যে, তার কাপড়ে পেশাব লেগেছে তাহলে পেশাব লাগার স্থানটি ধুয়ে ফেলা আবশ্যক। নাপাকির স্থানে পানি ছিটিয়ে দেয়া কিংবা মুছে ফেলা যথেষ্ট নয়। বরং আবশ্যক হল ধুয়ে ফেলা ও পানি প্রবাহিত করা।

যদি কেউ সন্দেহ করে যে, তার কাপড়ে কি পেশাব লেগেছে; নাকি লাগেনি; সেক্ষেত্রে কাপড় ধৌত করা তার উপর আবশ্যকীয় নয়। কেননা মূল অবস্থা হচ্ছে- পোশাকের পবিত্রতা; যতক্ষণ পর্যন্ত না পোশাকে নাপাকি লাগার ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যায়।

স্থায়ী কমিটির আলেমগণ বলেন: যদি আপনি পেশাবের ফোটা পড়ার ব্যাপারে নিশ্চিত হন তাহলে ইস্তিনজা (পেশাব থেকে শৌচ করা), প্রত্যেক নামাযের জন্য ওযু করা এবং পোশাকের যে স্থানে পেশাব লেগেছে সে স্থান ধৌত করা আবশ্যক। আর যদি সন্দেহ হয় সেক্ষেত্রে তার উপর সেটা আবশ্যক নয়। তবে, সন্দেহকে এড়িয়ে চলা উচিত; যাতে করে ব্যক্তি ওয়াসওয়াসাগ্রস্ত হয়ে না পড়ে।[সমাপ্ত]

[ফাতাওয়াল লাজনাহ আ-দায়িমা (৫/১০৬)]

মানুষ তার দ্বীনের উপকারী বিষয়ে প্রশ্ন করতে দোষের কিছু নেই, এটি ওয়াসওয়াসা নয়। বরং এটি হচ্ছে- পরিপূর্ণভাবে দ্বীন পালনের চেষ্টা ও ভাল কাজের ব্যাপারে আগ্রহ।

আমরা আল্লাহ্‌র কাছে প্রার্থনা করছি তিনি যেন আমাদেরকে ও আপনাকে সকল ভাল কাজের তাওফিক দেন। নিশ্চয় তিনি সে ক্ষমতা রাখেন।

আল্লাহ্‌ই সর্বজ্ঞ।

মোজার উপর মাসেহ করার মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার পর কতটুকু সময় পবিত্রতা অটুট থাকবে

আলহামদুলিল্লাহ।

শাইখ উছাইমীন (রহঃ) বলেন:

সঠিক মতানুযায়ী মাসেহ করার মেয়াদ শেষ হলেও ওজু ভাঙ্গবে না। অর্থাৎ যদি মাসেহ করার মেয়াদ দুপুর ১২ টায় শেষ হয়ে যায়; কিন্তু রাত পর্যন্ত আপনার পবিত্রতা ভঙ্গ না হয় তাহলে আপনি পবিত্রতার উপর রয়েছেন। কেননা মাসেহ করার সময় শেষ হওয়ার সাথে সাথে ওজু ভেঙ্গে যায় এই মর্মে কোন দলিল নেই। রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাসেহ করার সময়কাল নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন; কিন্তু তিনি পবিত্রতার সময়কাল নির্দিষ্ট করে দেননি। তালিবুল ইলমের উচিত এ নিয়মটি খেয়াল রাখা; সেটা হচ্ছে– যে জিনিস কোন শরয়ি দলিলের মাধ্যমে সাব্যস্ত হয়েছে সেটা শরয়ি দলিল ছাড়া রহিত হবে না। কেননা মূলনীতি হচ্ছে– যেটা যে অবস্থায় আছে সেটা সে অবস্থায় অটুট থাকা।

আল্লাহ্‌ই অধিক জ্ঞাত।

বিদাত

আশুরা উপলক্ষে প্রস্তুতকৃত খাবার খাওয়ার হুকুম

আলহামদুলিল্লাহ।

আশুরা এলে শিয়ারা নিজের গালে চপেটাঘাত করা, নিজেকে প্রহার করা, মাথায় জখম করা, রক্তপাত করা ও খাবার প্রস্তুত করা ইত্যাদি যা করে থাকে সবগুলো নব-প্রচলিত গর্হিত বিদাত। এগুলোতে অংশ গ্রহণ করা কিংবা এগুলো পালনে তাদেরকে সহযোগিতা করা নাজায়েয। কেননা সেটা হবে পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে সহযোগিতা করা।

তারা তাদের বিদাত ও ভ্রষ্টতা বাস্তবায়নের জন্য যে খাবার প্রস্তুত করে থাকে সে খাবার খাওয়া নাজায়েয।

শাইখ বিন বায (রহঃ) বলেন: “এটি জঘন্য গর্হিত কাজ ও গর্হিত বিদাত। এটি বর্জন করা ওয়াজিব। এতে অংশ গ্রহণ করা নাজায়েয। এ উপলক্ষে যে খাবার পেশ করা হয় তা খাওয়া নাজায়েয।”

তিনি আরও বলেন: “এতে অংশগ্রহণ করা, যে সব পশু জবাই করা হয় সেগুলোর গোশত খাওয়া, যে সব পানীয় সরবরাহ করা হয় তা পান করা– নাজায়েয। আর যদি জবাইকারী প্রাণীটিকে আল্লাহ্‌ ছাড়া অন্য কারো জন্য জবাই করে থাকে যেমন- আহলে বাইত (নবীর পরিবার) এর জন্য কিংবা অন্য কারো জন্য তাহলে সেটা ‘বড় শিরক’। যেহেতু আল্লাহ্‌ তাআলা বলেন:  “বলুন, আমার সালাত, আমার কুরবানী, আমার জীবন ও আমার মরণ সৃষ্টিকুলের রব আল্লাহ্‌রই জন্য। তাঁর কোন শরীক নেই। আর আমাকে এরই নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। এবং আমি মুসলিমদের মধ্যে প্রথম।”[সূরা আনআম, আয়াত: ১৬২-১৬৩] আল্লাহ্‌ তাআলা আরও বলেন: “নিশ্চয় আমরা আপনাকে কাউছার দান করেছি। অতএব, আপনি আপনার রবের জন্য নামায আদায় করুন এবং কুরবানি করুন।”[সূরা আল-কাউছার, আয়াত: ১-২]

[ফাতাওয়াস শাইখ আব্দুল আযিয বিন বায, (৮/৩২০)]

তবে, তাদের খাবার গ্রহণ না করলে যদি আপনি বিপদের মুখোমুখি হন সে ক্ষেত্রে এই ক্ষতি থেকে বাঁচার জন্য সে খাবার গ্রহণে কোন গুনাহ্‌ নেই।

আল্লাহ্‌ই ভাল জানেন।

ইসরা ও মেরাজের রাত্রি উদযাপন

আলহামদুলিল্লাহ।

নিঃসন্দেহে ইসরা ও মেরাজ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর রিসালাতের সত্যতার পক্ষে ও আল্লাহ্‌র কাছে তাঁর মহান মর্যাদার সপক্ষে আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে মহান নিদর্শনাবলির অন্যতম। একইভাবে এটি আল্লাহ্‌র মহা ক্ষমতা ও তিনি তাঁর সকল সৃষ্টির ঊর্ধ্বে থাকার একটি বড় প্রমাণ। আল্লাহ্‌ তাআলা বলেন: “পবিত্র মহিমাময় তিনি, যিনি তাঁর বান্দাকে রাত্রিকালে মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসাতে ভ্রমণ করিয়েছেন; যে মসজিদের চারপাশে আমরা বরকত দিয়েছি; যাতে করে আমরা তাকে আমাদের নিদর্শনাবলি দেখাতে পারি। নিশ্চয় তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা।”[সূরা বনী ইসরাইল, আয়াত: ১]

রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে মুতাওয়াতির সূত্রে বর্ণিত হয়েছে যে, তাঁকে আসমানের দিকে ঊর্ধ্বে মিরাজ করানো হয়েছে। তাঁর জন্য আসমানের দরজাগুলো খুলে দেয়া হয়েছে; এমনকি তিনি সপ্ত আকাশ পাড়ি দিয়েছেন। এরপর তাঁর রব্ব তাঁর সাথে যা ইচ্ছা কথা বলেছেন এবং তাঁর উপর নামায ফরয করেছেন। প্রথমে আল্লাহ্‌ তাঁর উপর পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামায ফরয করেন। কিন্তু, তিনি আল্লাহ্‌র কাছে নামায কমানোর জন্য বারবার ধর্ণা দেন; এক পর্যায়ে নামায পাঁচ ওয়াক্তে স্থির করা হয়। ফরয দায়িত্ব বা আবশ্যকীয় দায়িত্ব হিসেবে নামায পাঁচ ওয়াক্ত। কিন্তু, প্রতিদানের ক্ষেত্রে এটি পঞ্চাশ ওয়াক্ত। কেননা, এক নেকীতে দশ নেকীর সওয়াব রাখা হয়েছে। সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ্‌র জন্য। যাবতীয় নিয়ামতের জন্য তাঁরই শুকরিয়া।

যে রাত্রিতে মেরাজ সংগঠিত হয়েছে সে রাত্রিকে সুনির্দিষ্ট করে কোন হাদিস বর্ণিত হয়নি; না রজব মাসের ব্যাপারে; আর না অন্য কোন মাসের ব্যাপারে। সে রাত্রিকে নির্দিষ্ট করে যে সব বর্ণনা উদ্ধৃত হয়েছে সে বর্ণনাগুলোর কোনটি হাদিস বিশারদদের নিকট নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে সাব্যস্ত নয়। সে রাত্রিটিকে সুনির্দিষ্ট করণ থেকে মানুষকে ভুলিয়ে দেয়ার মধ্যে আল্লাহ্‌ তাআলার মহান কোন হেকমত নিহিত রয়েছে। যদি সে রাত্রিটি সুনির্দিষ্টভাবে সাব্যস্ত হত তদুপরি সে রাত্রিতে বিশেষ কোন ইবাদত পালন করা মুসলমানদের জন্য জায়েয হত না, সে রাত্রিটি উদযাপন করাও সঙ্গত হত না। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর সাহাবীবর্গ এ দিবসটি উদযাপন করেননি এবং এ দিবসে বিশেষ কোন ইবাদত পালন করেননি। যদি সে দিবসটি পালন করা শরিয়তের বিধান হত তাহলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মতের জন্য সেটা বর্ণনা করতেন; হয়তো কথার মাধ্যমে কিংবা তাঁর আমলের মাধ্যমে। আর সে রকম কিছু ঘটলে সে কথা সবাই জানতে পারত এবং সাহাবায়ে কেরাম আমাদের কাছে সেটা বর্ণনা করতেন। কেননা, উম্মতের যা কিছু প্রয়োজন এর সবকিছু তারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেছেন। দ্বীনি কোন বিষয় বর্ণনা করার ক্ষেত্রে তাঁরা অবহেলা করেননি। বরং তাঁরা যে কোন ভাল কাজে অগ্রণী ছিলেন। যদি এ দিবসটি উদযাপন করা শরিয়তসম্মত হত তাহলে তাঁরা সবার আগে সেটা উদযাপনে এগিয়ে যেতেন। আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি্ ওয়া সাল্লাম হচ্ছেন মানুষের জন্য সর্বাধিক কল্যাণকামী। তিনি রাসূলের দায়িত্ব পরিপূর্ণভাবে পালন করেছেন, আমানত যথাযথভাবে পৌঁছে দিয়েছেন। সুতরাং এ রাতকে বিশেষ মর্যাদা দেয়া ও পালন করা যদি দ্বীনি বিষয় হত তাহলে এক্ষেত্রে তিনি গাফেল থাকতেন না এবং এটি গোপন করতেন না। যেহেতু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে এমন কিছু আসেনি অতএব বুঝতে হবে এ রাতকে বিশেষ মর্যাদা দেয়া ও এ রাতটি উদযাপন করা ইসলামী কাজ নয়। আল্লাহ্‌ তাআলা এ উম্মতের জন্য দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিয়েছেন এবং তাদের জন্য নেয়ামতকে পরিপূর্ণ করে দিয়েছেন এবং যে ব্যক্তি আল্লাহ্‌র অনুমোদন ছাড়া এ দ্বীনের মধ্যে নব কিছু চালু করবে তার নিন্দা করেছেন। আল্লাহ্‌ তাআলা সূরা মায়িদাতে বলেন: “আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম এবং তোমাদের উপর আমার নেয়ামত সম্পূর্ণ করলাম, আর তোমাদের জন্য ইসলামকে দ্বীন (ধর্ম) হিসেবে পছন্দ করলাম।”[সূরা মায়িদা, আয়াত: ৩] তিনি আরও বলেন: “তাদের কি এমন কিছু শরীক রয়েছে যারা এমন বিধান জারী করেছে আল্লাহ্‌ যা করার অনুমোদন দেননি?”[সূরা সূরা, আয়াত: ২১]

সহিহ হাদিসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি্ ওয়া সাল্লাম কর্তৃক বিদাত (নবপ্রবর্তিত বিষয়) থেকে হুশিয়ার করা সাব্যস্ত হয়েছে। তিনি স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছেন: বিদাত হচ্ছে- ভ্রষ্টতা। যাতে করে উম্মত সাবধান হতে পারে এবং বিদাতে লিপ্ত হওয়া থেকে দূরে থাকতে পারে।

এ সংক্রান্ত হাদিসের মধ্যে রয়েছে যে হাদিসটি সহিহ বুখারী ও সহিহ মুসলিমে আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, “যে ব্যক্তি আমাদের দ্বীনে নতুন কিছু চালু করে সেটা প্রত্যাখ্যাত।” সহিহ মুসলিমের অপর বর্ণনায় এসেছে “যে ব্যক্তি এমন কোন আমল করে আমাদের দ্বীনে যার অনুমোদন নেই সেটা প্রত্যাখ্যাত।” সহিহ মুসলিমে জাবির (রাঃ) থেকে আরও বর্ণিত হয়েছে যে, “নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জুমার দিনে খুতবাকালে বলতেন: “আম্মাবাদ। সর্বোত্তম বাণী হচ্ছে- আল্লাহ্‌র কিতাব। সর্বোত্তম আদর্শ হচ্ছে- মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদর্শ। সর্বনিকৃষ্ট বিষয় হচ্ছে- নবপ্রচলিত বিষয়াবলী। প্রত্যেক বিদাতই হচ্ছে- ভ্রষ্টতা।” জায়্যিদ সনদে ইমাম নাসাঈ আরেকটু বৃদ্ধি করে বর্ণনা করেন যে, “আর প্রত্যেকটি ভ্রষ্টতা জাহান্নামে যাবে।” সুনান গ্রন্থসমূহে ইরবায বিন সারিয়া (রাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি বলেন:  রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একবার আমাদেরকে ওয়ায করলেন; খুবই হৃদয়াগ্রহী ওয়ায। সে ওয়াযে হৃদয়গুলো ক্রন্দন করল, চক্ষু অশ্রু বিসর্জন করল। আমরা বললাম: ইয়া রাসূলুল্লাহ্‌! এটি যেন বিদায়ী ভাষণ। আমাদেরকে কিছু ওসিয়ত করুন। তিনি বলেন: “আমি তোমাদেরকে আল্লাহ্‌-ভীতির ওসিয়ত করছি। শ্রবণ ও মান্য করার ওসিয়ত করছি; এমনকি তোমাদের উপর কোন ক্রীতদাস নেতা হলে তবুও। কারণ তোমাদের মধ্যে যারা হায়াত পাবে তারা অনেক মতানৈক্য দেখতে পাবে। আমার পরে তোমাদের কর্তব্য হবে আমার সুন্নত ও খোলাফায়ে রাশেদীন এর সুন্নত পালন করা। এই সুন্নতকে আঁকড়ে ধর, মাড়ির দাঁত দিয়ে কামড়ে ধর। আর সকল নব প্রচলিত বিষয় থেকে দূরে থাকবে। কেননা প্রত্যেকটা নবপ্রচলিত বিষয় বিদাত। প্রত্যেকটি বিদাত ভ্রষ্টতা।” এ অর্থবোধক অনেক হাদিস রয়েছে।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবীবর্গ থেকে এবং তাদের পরবর্তীতে সলফে সালেহীন থেকে বিদাত থেকে সাবধানকরণ ও সতর্কীকরণ সাব্যস্ত হয়েছে। এর কারণ হল,  বিদাত হচ্ছে- দ্বীনের মধ্যে বৃদ্ধিকরণ এবং আল্লাহ্‌র অনুমোদন ছাড়া বিধান প্রণয়ন করণ এবং আল্লাহ্‌র শত্রু ইহুদী ও খ্রিস্টানদের সাথে সাদৃশ্য গ্রহণ করণ; যেহেতু তারা তাদের ধর্মের মধ্যে এমন কিছু সংযোজন, পরিবর্ধন করেছে আল্লাহ্‌ যা অনুমোদন করেননি। এটি করা হলে এর অর্থ হচ্ছে ইসলাম ধর্মকে ছোট করা ও অপরিপূর্ণতার দোষারোপ করা। এ ধরণের বিষয় যে কত জঘন্য, ন্যাক্কারজনক এবং আল্লাহ্‌র বাণী “আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের ধর্মকে পরিপূর্ণ করে দিলাম” এর সাথে সাংঘর্ষিক তা সবারই জানা। অনুরূপভাবে তা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত হাদিসগুলোর সাথেও সাংঘর্ষিক যেগুলোতে তিনি বিদাত থেকে সতর্ক করেছেন।

আমরা আশা করছি, এতক্ষণ পর্যন্ত যা কিছু উল্লেখ করা হয়েছে একজন সত্যান্বেষী ব্যক্তির জন্য এ বিদাতকে অর্থাৎ মিরাজের রাত উদযাপনের বিদাতকে অস্বীকার করার ক্ষেত্রে, এ বিদাত থেকে হুশিয়ার করার প্রসঙ্গে এবং এটি যে, ইসলামী কোন কাজ নয় সে ব্যাপারে এগুলো যথেষ্ট ও সন্তোষজনক।

মুসলিম উম্মহর কল্যাণ কামনা করা, আল্লাহ্‌র দ্বীন বর্ণনা করা ও ইলম গোপন না করা আল্লাহ্‌ ফরয করেছেন বিধায় আমরা মুসলিম ভাইদেরকে এ বিদাত সম্পর্কে সাবধান করতে চেয়েছি; যে বিদাতটি দেশে দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। এমনকি লোকেরা ধারণা করছে এটি ধর্মীয় কাজ। আমরা আল্লাহ্‌র কাছে প্রার্থনা করছি তিনি যেন মুসলিম উম্মাহর অবস্থা পরিবর্তন করে দেন এবং তাদেরকে দ্বীনি বিষয়ে প্রজ্ঞা দান করেন। আমাদেরকে ও তাদেরকে সত্যকে আঁকড়ে ধরার ও সত্যের উপর অবিচল থাকার এবং সত্যের বিরোধিতা বর্জন করার তাওফিক দেন। নিশ্চয় তিনি সে ক্ষমতা রাখেন। আল্লাহ্‌ তাঁর বান্দা ও রাসূল, আমাদের নবী মুহাম্মদের উপর তাঁর রহমত ও শান্তি বর্ষন করুন।

নিজের জন্মদিন ও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্মদিনে রোযা রাখা

আলহামদুলিল্লাহ।

এক:

সহিহ মুসলিমে আবু কাতাদা (রাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সোমবারে রোযা রাখা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন: “এটি এমন দিন যে দিনে আমি জন্মগ্রহণ করেছি এবং যেদিন আমার ওপর ওহি নাযিল হয়”।

ইমাম তিরমিযি (রহঃ) আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “প্রতি সোমবারে ও বৃহস্পতিবারে আমলনামা পেশ করা হয়। তাই আমি পছন্দ করি আমি রোযা রেখেছি এমতাবস্থায় যেন আমার আমলনামা উপস্থাপন করা হয়”[তিরমিযি হাদিসটিকে ‘হাসান’ আখ্যায়িত করেছেন। আলবানী ‘সহিহুত তিরমিযি’ গ্রন্থে হাদিসটিকে ‘সহিহ’ আখ্যায়িত করেছেন]

পূর্বোক্ত হাদিস থেকে জানা গেল যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সোমবার তাঁর জন্মদিন হওয়ার কারণে যেমন রোযা রেখেছেন তেমনি এ দিনটির মর্যাদার কারণেও রোযা রেখেছিলেন। কেননা এ দিনে আল্লাহ তাঁর ওপর ওহী নাযিল করেছেন। এ দিনে তাঁর আমলনামা আল্লাহর কাছে পেশ করা হয়। তাই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রোযা থাকা অবস্থায় তাঁর আমলনামা পেশ হওয়া চাইতেন। এজন্য ঐ দিনে রোযা রাখার অনেকগুলো কারণের মধ্যে ঐ দিনে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্ম হওয়াটাও একটি কারণ।

সুতরাং যে ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মত সোমবারে রোযা রাখতে চান, এর মাধ্যমে ক্ষমার আশা করেন, আল্লাহ তার বান্দাদেরকে যে সব নেয়ামত দিয়েছেন সেগুলোর শুকরিয়া আদায় করতে চান; যে নেয়ামতগুলোর মধ্যে সেরা নেয়ামত হচ্ছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্ম ও তাঁর নবুয়ত এবং সেই দিনে ক্ষমাপ্রার্থীদের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার প্রত্যাশা করেন— তাহলে এটি একটি ভাল আমল এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে, বিশেষ কোন সপ্তাহে এ আমলটি করা অন্য সপ্তাহে না করা এবং বিশেষ কোন মাসে এ আমলটি করা অন্য মাসে না করা— এমনটি যেন না হয়। বরং ব্যক্তি তার সাধ্যানুযায়ী সবসময় এটি করবে।

আর মিলাদুন্নবী পালনের উদ্দেশ্যে বছরের বিশেষ একটি দিনে এ আমলটি করা— এটি বিদআত ও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহর খেলাফ। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সোমবারে রোযা রেখেছেন। অথচ মিলাদুন্নবী পালনের নির্দিষ্ট এ দিনটি সোমবারেও পড়তে পারে; আবার সপ্তাহের অন্য কোন দিনও হতে পারে।

মিলাদুন্নবী পালনের হুকুম ও এ সম্পর্কে জানতে পড়ুন 13810 নং ও 70317 নং প্রশ্নোত্তর।

দুই:

বর্তমানে সাধারণ মানুষের মাঝে ‘জন্মদিন’ পালনের নামে বিশেষ দিন উদযাপনের যে প্রথা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে— এটি বিদআত ও শরিয়ত বিরোধী। ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা ছাড়া মুসলমানদের আর কোন উৎসব (দিন পালন) নেই। ইতিপূর্বে একাধিক প্রশ্নোত্তরে সে বিষয়টি আলোচিত হয়েছে। পড়ুন 26804 নং ও 9485নং প্রশ্নোত্তর।

এছাড়া যে নবী হচ্ছেন— প্রকৃত নেয়ামত ও সকল মানুষের জন্য রহমত, যাঁর ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, “আমি আপনাকে বিশ্ববাসীর জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছি”[সূরা আম্বিয়া, আয়াত: ১০৭], যিনি হচ্ছেন সকল মানুষের জন্য কল্যাণের পথ উন্মোচনকারী তাঁর জন্মদিন এর সাথে অন্য মানুষের জন্মদিবস বা মৃত্যুদিবসের তুলনা কিভাবে চলে?

তাছাড়া তাঁর সাহাবীগণ ও তাদের পরবর্তী সলফে সালেহীনের কেউ কি এমন কিছু পালন করেছেন?

বরঞ্চ সলফে সালেহীন ও পূর্ববর্তী আলেমদের কেউ এ কথা বলেছেন বলে জানা যায় না যে, সপ্তাহের বিশেষ একটি দিনে, কিংবা মাসের বিশেষ একটি দিনে, কিংবা বছরের বিশেষ একটি দিনে রোযা রাখা কিংবা সে দিনটি উদযাপন করা শরিয়তসম্মত; যেহেতু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সপ্তাহের যে বারটিতে জন্মগ্রহণ করেছেন সেই বারে অর্থাৎ সোমবারে রোযা রাখতেন। যদি এটা শরিয়তসম্মত আমল হত তাহলে পূর্ববর্তী আলেমগণ ও নেকীর কাজে অগ্রগামী ব্যক্তিগণ এ দিনটি পালন করতেন। যখন তাঁরা সেটা করেননি কাজেই জানা গেল যে, এটি নব-প্রচলিত; এটি পালন করা যাবে না।

বিদাতী উৎসব পালন: ঈদে মিলাদুন্নবী, শিশুদের জন্মদিন, মা দিবস, কিংবা বৃক্ষরোপন-সপ্তাহ ইত্যাদি উদযাপন করার বিধান কি?

আলহামদুলিল্লাহ।

এক:

স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় বছর ঘুরে, মাস ঘুরে কিংবা সপ্তাহ ঘুরে যে সম্মিলন বার বার ফিরে আসে সেটাই ঈদ বা উৎসব। ঈদ নিম্নোক্ত বৈশিষ্টগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করে: পুনঃ পুনঃ ফিরে আসে এমন দিন; যেমন- ঈদুল ফিতর ও জুমার দিন। ঐ দিনে সম্মিলন ঘটা। ঐদিনে যে কর্মগুলো করা হয় সেগুলো ইবাদত শ্রেণীর কিংবা প্রথাগত।

দুই:

এ দিবসগুলোর মধ্যে যে দিবস দ্বারা উদ্দেশ্য হয় ইবাদত ও নৈকট্য হাছিল কিংবা সওয়াব অর্জনের জন্য সম্মান প্রদর্শন কিংবা যে দিবসের ক্ষেত্রে জাহেলি যুগের লোক বা তাদের মত অন্য কাফের গোষ্ঠীর সাথে সাদৃশ্য পাওয়া যায় সেগুলো নব-উদ্ভাবিত ও নিন্দনীয় বিদাত এবং সেটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিম্নোক্ত বাণীর মধ্যে পড়ে যাবে “যে ব্যক্তি আমাদের শরিয়তে এমন কিছু চালু করবে যা শরিয়তে নেই সেটা প্রত্যাখ্যাত।”[সহিহ বুখারী ও সহিহ মুসলিম]

এর উদাহরণ হচ্ছে­– ঈদে মিলাদুন্নবী, মা দিবস, জাতীয় দিবস ইত্যাদি পালন করা। এগুলোর মধ্যে প্রথমটিতে এমন এক ইবাদত এর নবপ্রচলন রয়েছে আল্লাহ্‌ যার অনুমোদন দেননি। এছাড়াও এর মধ্যে খ্রিস্টান ও অন্যান্য কাফেরদের সাথে সাদৃশ্য রয়েছে। দ্বিতীয় ও তৃতীয়টির মধ্যে কাফেরদের সাথে সাদৃশ্য রয়েছে।

পক্ষান্তরে, যে সব দিবসগুলো পালনের উদ্দেশ্য হচ্ছে– উম্মতের কল্যাণ সাধনে তাদের কর্মে শৃঙ্খলা আনা, পাঠদানের সময়সূচী বিন্যস্ত করা, কর্মকর্তাদের মিটিং এর সময়সূচী বিন্যস্ত করা ইত্যাদি যেগুলো মূলতঃই আল্লাহ্‌র নৈকট্য, তাঁর ইবাদত, কিংবা সম্মানপ্রদর্শনের সাথে সংশ্লিষ্ট নয় সেগুলো হচ্ছে– অভ্যাসগত বিদাত; যেগুলো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি্ ওয়া সাল্লামের বাণী: “যে ব্যক্তি আমাদের শরিয়তে এমন কিছু চালু করে যা শরিয়তে নেই সেটা প্রত্যাখ্যাত” এর অধিভুক্ত হবে না। তাই সেগুলোতে দোষের কিছু নেই।

আল্লাহ্‌ই উত্তম তাওফিকদাতা, আমাদের নবী মুহাম্মদ, তাঁর পরিবার-পরিজন ও তাঁর সাহাবীবর্গের ওপর আল্লাহ্‌র রহমত বর্ষিত হোক।

হজ্জ ও কুরবানি

প্রশ্ন: আমাদের এক শাইখ বলেন: আরাফার দিন রোযা রাখা সুন্নত নয়; এদিন রোযা রাখা নাজায়েয। আশা করি, আপনারা এ প্রশ্নটির জবাব দিবেন। কেননা সে শাইখ এমন কিছু প্রচারপত্র বিলি করছেন যার মাধ্যমে তিনি আরাফার দিন রোযা রাখতে নিষেধ করছেন। আশা করব, আপনারা জবাব দিবেন।

আলহামদুলিল্লাহ।

যারা হাজী নন তাদের জন্য এই দিন রোযা রাখা সুন্নতে মুয়াক্কাদা। আবু কাতাদা (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আরাফার দিনের রোযা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন: “বিগত ও আগত বছরের পাপ মোছন করে”[সহিহ মুসলিম (১১৬২), সহিহ মুসলিমের অন্য এক বর্ণনায় আছে: আমি আল্লাহর কাছে প্রত্যাশা করছি যে, আগের বছরের ও পরের বছরের গুনাহ মোছন করবে]

ইমাম নববী ‘আল-মাজমু’ গ্রন্থে (৬/৪২৮) বলেন -যেটি শাফেয়ি মাযহাবের কিতাব-: “এ মাসয়ালার হুকুম হচ্ছে- ইমাম শাফেয়ি ও ছাত্ররা বলেন: যারা আরাফায় নেই তাদের জন্য আরাফার দিন রোযা রাখা মুস্তাহাব”।

পক্ষান্তরে, হজ্জপালনকারী যিনি আরাফার ময়দানে হাজির তার ব্যাপারে মুখতাসার গ্রন্থে রয়েছে ইমাম শাফেয়ি ও মাযহাবের অন্য আলেমগণ বলেন: উম্মের ফযল এর হাদিসের ভিত্তিতে তার জন্য সেদিন রোযা না-রাখা মুস্তাহাব। আমাদের অন্য একদল আলেম বলেন: হজ্জপালনকারীর জন্য এদিন রোযা রাখা মাকরুহ। যারা এ অভিমত স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেছেন তারা হচ্ছে- দারেমী, বন্দানিজি, মুহামিলি ‘আল-মাজমু’ গ্রন্থে, গ্রন্থকার ‘তানবীহ’ নামক গ্রন্থে এবং অন্যান্য আলেমগণ”[সমাপ্ত]

ইবনে কুদামা (রহঃ) ‘আল-মুগনী’ গ্রন্থে (৪/৪৪৩) বলেন যেটি হাম্বলি মাযহাবের গ্রন্থ: “এটি একটি মহান ও মর্যাদাপূর্ণ দিন। পবিত্র ঈদের দিন। এর মর্যাদা মহান। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, এ দিনের রোযা দুই বছরের গুনাহ মোছন করে।”[সমাপ্ত]

ইবনে মুফলিহ (রহঃ) ‘আল-ফুরু’ নামক গ্রন্থে (৩/১০৮) বলেন:

“এটি একটি মহান ও সম্মানিত দিন। পবিত্র ঈদের দিন। এর মর্যাদা অনেক বড়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে সহিহ হাদিসে এসেছে- এ দিনের রোযা এক বছরের গুনাহ মোছন করে।”[সমাপ্ত]

ইবনে মুফলিহ (রহঃ) ‘আল-ফুরু’ গ্রন্থে (৩/১০৮) বলেন- এটি হাম্বলি মাযহাবের কিতাব-: যিলহজ্জের দশদিন রোযা রাখা মুস্তাহাব। ৯ তারিখের রোযাটি সবচেয়ে বেশি তাগিদপূর্ণ। এ দিনটি হচ্ছে- আরাফার দিন। ইজমার মাধ্যমে এটি সাব্যস্ত।[সমাপ্ত]

হানাফি মাযহাবের কিতাব ‘বাদায়েউস সানায়ি’ গ্রন্থে (২/৭৬) গ্রন্থকার ‘কাসানি’ বলেন:

যারা হাজী নন তাদের জন্য আরাফার দিন রোযা রাখা মুস্তাহাব। এ দিনে রোযা রাখা মুস্তাহাব হওয়ার পক্ষে অনেক হাদিস বর্ণিত হওয়ার কারণে। কারণ অন্যদিনগুলোর উপর এদিনের বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। হাজীর জন্যেও এদিনের রোযা রাখা মুস্তাহাব; যদি রোযা রাখার কারণে হাজী দুর্বল হয়ে আরাফায় অবস্থান ও দোয়া করা থেকে বাধাগ্রস্ত না হয়। যেহেতু রোযা রাখার মাধ্যমে এ দুটো নেককাজ একত্রে আদায় করা যায়। আর যদি রোযা রাখতে গিয়ে হাজী দুর্বল হয়ে পড়ে তাহলে রোযা রাখা মাকরুহ। কারণ এদিনে রোযা রাখার ফযিলত অন্য বছর অর্জন করা সম্ভব; স্বভাবতঃ সম্ভব হয়। কিন্তু, আরাফায় অবস্থান ও দোয়া করার ফযিলত সাধারণতঃ সাধারণ মুসলমানের ক্ষেত্রে জীবনে একবারের বেশি অর্জন করা সম্ভব হয় না। তাই সে ফযিলতটি অর্জনে সচেষ্ট হওয়া উত্তম।”

মালেকী মাযহাবের আলেম খিরাশী কর্তৃক রচিত ‘শারহু মুখতাসার খলিল’ রয়েছে:

“হজ্জ না করলে আরাফার দিনে রোযা রাখা এবং যিলহজ্জের দশদিন রোযা রাখা” ব্যাখ্যা: গ্রন্থকারের উদ্দেশ্য হচ্ছে- যিনি হাজী নন তার জন্য আরাফার দিন রোযা রাখা মুস্তাহাব। আর হাজীর জন্য রোযা না-রাখা মুস্তাহাব; যাতে করে দোয়া করার জন্য শক্তি থাকে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হজ্জের সময় রোযা রাখেননি।”[সমাপ্ত]

‘হাশিয়াতুদ দুসুকী’ গ্রন্থে এসেছে-

অতঃপর তাঁর কথা: ‘এবং আরাফার দিনে রোযা রাখা মুস্তাহাব…’ এর উদ্দেশ্য হচ্ছে- আরাফার দিনে রোযা রাখা জোরালো-মুস্তাহাব; নচেৎ রোযা রাখাটাই একটি মুস্তাহাব আমল।”

শাইখ উছাইমীন (রহঃ) জিজ্ঞেস করা হয়েছিল: আরাফার দিন হজ্জপালনকারী নন ও হজ্জপালনকারীর জন্য রোযা রাখার হুকুম কি?

উত্তরে তিনি বলেন: যিনি হজ্জপালন করছেন না তার জন্যে আরাফার দিন রোযা রাখা সুন্নতে মুয়াক্কাদা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আরাফার দিন রোযা রাখা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন: “আমি আল্লাহর নিকট প্রত্যাশা করছি যে, বিগত বছর ও পরবর্তী বছরের গুনাহ মার্জনা করবে।” অন্য এক রেওয়ায়েতে আছে “গত বছর ও পরের বছরের গুনাহ মার্জনা করবে।”

পক্ষান্তরে, হাজীদের জন্য আরাফার দিন রোযা রাখা সুন্নত নয়। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিদায়ী হজ্জকালে আরাফার দিন রোযা রাখেননি। সহিহ বুখারীতে মায়মুনা (রাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরাফার দিন রোযা রেখেছেন; নাকি রাখেননি এ ব্যাপারে কিছু মানুষ সন্দেহে ছিল। তখন আমি তাঁর জন্য এক পেয়ালা দুধ পাঠালাম; তখন তিনি আরাফার ময়দানে অবস্থান করছিলেন। তিনি দুধ পান করলেন; লোকেরা তাঁর দিকে তাকিয়ে ছিল।”[সমাপ্ত]

[মাজমুউ ফাতাওয়া ইবনে উছাইমীন, খণ্ড ২০, প্রশ্ন ৪০৪]

তাই হজ্জপালনকারীর জন্য আরাফার দিন রোযা রাখা মাকরূহ; মুস্তাহাব নয়। অতএব, উল্লেখিত বক্তা যদি হজ্জপালনকারীকে উদ্দেশ্য করে থাকেন তাহলে তাঁর কথা ঠিক। আর যদি তার উদ্দেশ্য হয় যে, যারা হজ্জ পালন করছে না তাদের জন্য আরাফার দিন রোযা রাখা শরিয়তসম্মত নয়; তাহলে এটি সুস্পষ্ট ভুল এবং ইতিপূর্বের আলোচনায় সহিহ সুন্নাতে সাব্যস্ত বিষয়ের বরখেলাফ।

আল্লাহই ভাল জানেন।

প্রশ্ন: আমি, আমার স্ত্রী ও সন্তানেরা সহ পরিবারের সদস্য আটজন। আমাদের জন্য কি একটি কোরবানীর পশু যথেষ্ট হবে? নাকি প্রত্যেকের পক্ষ থেকে একটি পশু কোরবানী দিতে হবে? যদি একটি পশু যথেষ্ট হয় তাহলে আমি ও আমার প্রতিবেশী একই কোরবানীর পশুতে অংশীদার হওয়া বৈধ হবে কি?

আলহামদুলিল্লাহ।

এক:

কোরবানীর পশু হিসেবে একটি মেষ ব্যক্তি নিজের পক্ষ থেকে, তার পরিবারের সদস্যদের পক্ষ থেকে এবং যত মুসলমানের পক্ষ থেকে নিয়ত করে সবার পক্ষ থেকে যথেষ্ট হবে। দলিল হচ্ছে আয়েশা (রাঃ) এর হাদিস, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমন একটি মেষ আনার নির্দেশ দিলেন যেটির পায়ের রঙ কালো, পেটের রঙ কালো, চোখের রঙ কালো। নির্দেশ অনুযায়ী কোরবানীর জন্য মেষটি আনা হল। তখন তিনি আয়েশা (রাঃ) কে বললেন: হে আয়েশা! তুমি ছুরিটি নিয়ে আস (অর্থাৎ আমাকে ছুরিটি দাও)। তিনি ছুরিটি নিয়ে এলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছুরিটি এবং মেষটিকেও নিলেন। এরপর মেষটিকে শুইয়ে দিয়ে জবাই করলেন (অর্থাৎ জবাই করার প্রস্তুতি নিলেন)। এরপর বললেন: বিসমিল্লাহ, হে আল্লাহ! এটি মুহাম্মদের পক্ষ থেকে, মুহাম্মদের পরিবারের পক্ষ থেকে এবং উম্মতে মুহাম্মদীর পক্ষ থেকে কবুল করুন। অতঃপর তিনি সে মেষটি কোরবানী করলেন।[সহিহ মুসলিম]

ব্যাকেটের ভেতরের অংশটুকু ব্যাখ্যা; মূল হাদিসের অংশ নয়।

আবু আইয়ুব আনসারী (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেন: “নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি্ ওয়া সাল্লামের যামানায় একজন ব্যক্তি একটি ছাগল দিয়ে নিজের পক্ষ থেকে ও নিজের পরিবারের পক্ষ থেকে কোরবানী দিত। নিজেরা খেত এবং অন্যদেরকেও খাওয়াত।”।[সুনানে ইবনে মাজাহ ও সুনানে তিরমিযি; তিরমিযি হাদিসটিকে ‘সহিহ’ বলেছেন। আলবানী সহিহুত তিরমিযি গ্রন্থে (১২১৬) হাদিসটিকে ‘সহিহ’ আখ্যায়িত করেছেন]

অতএব, কোন লোক যদি একটি ছাগল কিংবা একটি ভেড়া দিয়ে কোরবানী দেয় তাহলে সেটা তার নিজের পক্ষ থেকে, তার পরিবারের মৃত বা জীবিত যত সদস্যদের পক্ষ থেকে নিয়ত করে সকলের পক্ষ থেকে জায়েয হবে। যদি আমভাবে বা খাসভাবে কোন নিয়ত না করে তাহলে ‘আহলে বাইত’ বা পরিবার বলতে মানুষের ব্যবহারে যাদেরকে বুঝায় কিংবা ভাষাগতভাবে যাদেরকে বুঝায় তারা সকলে এর অন্তর্ভুক্ত হবে। প্রথাগতভাবে ব্যক্তি যাদের ভরণপোষণ করে— স্ত্রী, সন্তান ও আত্মীয়স্বজন তাদেরকে পরিবার বলে। আভিধানিক অর্থে পরিবার বলতে ব্যক্তির সেসব আত্মীয়দেরকে বুঝায় যারা তার নিজের বংশধর, তার পিতার বংশধর, তার দাদার বংশধর কিংবা তার প্রপিতামহের বংশধর।

একটি মেষ দিয়ে যাদের যাদের পক্ষ থেকে কোরবানী করা জায়েয একটি উটের সপ্তমাংশ কিংবা একটি গরুর এক সপ্তমাংশ দিয়ে তাদের সবার পক্ষ থেকে কোরবানী করা জায়েয। তাই, কেউ যদি এক সপ্তমাংশ উট দিয়ে কিংবা এক সপ্তমাংশ গরু দিয়ে তার পক্ষ থেকে, তার পরিবারের পক্ষ থেকে কোরবানী দেয় সেটা জায়েয হবে। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি্ ওয়া সাল্লাম হাদির পশুর ক্ষেত্রে এক সপ্তমাংশ উট ও এক সপ্তমাংশ গরুকে একটি ছাগলের স্থলাভিষিক্ত করেছেন। অনুরূপ বিধান কোরবানীর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। যেহেতু এক্ষেত্রে কোরবানী ও হাদির মধ্যে কোন পার্থক্য নেই।

দুই:

দুই বা ততোধিক ব্যক্তি একটি মেষ ক্রয়ে অংশীদার হয়ে সবার পক্ষ থেকে কোরবানী দেয়া জায়েয নয়। কেননা কুরআন-সুন্নাতে এই মর্মে কিছু উদ্ধৃত হয়নি। অনুরূপভাবে আট বা ততোধিক ব্যক্তি একটি উট কিংবা একটি গরুতে অংশীদার হওয়া জায়েয নেই (তবে সাতজনের একটি উটে কিংবা গরুতে অংশীদার হওয়া জায়েয আছে)। কেননা ইবাদতগুলো তাওকিফিয়্যা (দলিলের সীমায় বিধান সীমাবদ্ধ এমন)। এগুলোর ক্ষেত্রে নির্ধারিত সীমা লঙ্ঘন করা যাবে না; সেটা সংখ্যাগত সীমা হোক কিংবা পদ্ধতিগত সীমা হোক। তবে, সওয়াবের ক্ষেত্রে অংশীদার করা যেতে পারে। যেমন সওয়াবের ক্ষেত্রে অগণিত মানুষকে অংশীদার করার কথা উল্লেখ আছে।

প্রশ্ন: কোন কাফেরকে কোরবানীর গোশত দেয়া জায়েয আছে কি?

আলহামদুলিল্লাহ।

শাইখ ইবনে উছাইমীন বলেন:

কোন কাফেরকে সদকার নিয়তে কোরবানীর গোশত দেয়া জায়েয আছে; তবে শর্ত হচ্ছে- সে কাফের যেন মুসলমানদেরকে হত্যাকারীদের দলভুক্ত না হয়। যদি সে কাফের মুসলমানদেরকে হত্যাকারীদের দলভুক্ত হয় তাহলে তাকে কোন কিছু দেওয়া যাবে না। দলিল হচ্ছে- আল্লাহর বাণী: “দ্বীনের ব্যাপারে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদেরকে স্বদেশ থেকে বহিস্কার করেনি তাদের প্রতি মহানুভবতা দেখাতে ও ন্যায়বিচার করতে আল্লাহ্‌ তোমাদেরকে নিষেধ করেন না। নিশ্চয় আল্লাহ্‌ ন্যায়পরায়ণদেরকে ভালবাসেন। আল্লাহ্‌ শুধু তাদের সাথে বন্ধুত্ব করতে নিষেধ করেন যারা দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের সাথে যুদ্ধ করেছে, তোমাদেরকে স্বদেশ থেকে বের করে দিয়েছে এবং তোমাদেরকে বের করাতে সাহায্য করেছে। আর তাদের সাথে যারা বন্ধুত্ব করে তারাই তো যালিম।”[সূরা মুমতাহিনা, আয়াত: ৮-৯]

প্রশ্ন: কোরবানীর পশু জবাই করার সময় জবাইকারী যদি বলে: এটি অমুকের পক্ষ থেকে অর্থাৎ কোরবানকারীর নাম উল্লেখ করে সেটা কি নিয়ত উচ্চারণ করার পর্যায়ে পড়বে?

আলহামদুলিল্লাহ।

এই কথা বলা নিয়ত উচ্চারণ করার মধ্যে পড়বে না। কেননা “এই পশু আমার ও আমার পরিবারের পক্ষ থেকে” জবাইকারীর এ কথা বলা তার অন্তরের সংবাদ মাত্র। জবাইকারী তো বলছে না যে,: ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি উরিদু আন উদাহ্‌হি’ (অর্থ- হে আল্লাহ, আমি কোরবানী করতে চাই) যেভাবে নিয়ত উচ্চারণকারী বলে থাকেন। তিনি তো শুধু তার অন্তরে যা রয়েছে তা প্রকাশ করেছেন মাত্র। নচেৎ নিয়ত তো এর আগেই পাকা হয়েছে: যখন থেকে তিনি কোরবানীর পশুটিকে হাজির করেছেন, মাটিতে শুইয়ে দিয়েছেন এবং জবাই করা শুরু করেছেন তখন থেকে তার নিয়ত পাকা হয়েছে।

প্রশ্ন: সাধারণ তাকবীর ও বিশেষ তাকবীর বলতে কী বুঝায়? এবং কখন শুরু হয়?

আলহামদুলিল্লাহ।

এক: তাকবীরের ফযিলত

যিলহজ্জ মাসের প্রথম দশদিন মহান দিন। আল্লাহ তাআলা তাঁর কিতাবে এ দিনগুলোকে দিয়ে শপথ করেছেন। কোন কিছুকে দিয়ে শপথ করা সে বিষয়ের গুরুত্ব ও মহান উপকারিতার প্রমাণ বহন করে। আল্লাহ তাআলা বলেন: “শপথ ফজরের ও দশরাত্রির”। ইবনে আব্বাস (রাঃ), ইবনে যুবাইর (রাঃ) ও অন্যান্য পূর্ববর্তী ও পরবর্তী আলেম বলেন: এ দিনগুলো হচ্ছে- যিলহজ্জ মাসের দশদিন। ইবনে কাছির (রহঃ) বলেন: “এটাই সঠিক”।[তাফসিরে ইবনে কাছির (৮/৪১৩)]

এ দিনগুলোর নেক আমল আল্লাহর কাছে প্রিয়। দলিল হচ্ছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী: “অন্য যে কোন সময়ের নেক আমলের চেয়ে এ দশদিনের নেক আমল আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয়। তারা (সাহাবীরা) বলেন: আল্লাহর পথে জিহাদও নয়?! রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: আল্লাহর পথে জিহাদও নয়; তবে কোন লোক যদি তার জানমাল নিয়ে আল্লাহর রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে এবং কোন কিছু নিয়ে ফেরত না আসে সেটা ভিন্ন কথা।”[সহিহ বুখারী (৯৬৯) ও সুনানে তিরমিযি (৭৫৭); হাদিসের এ ভাষ্যটি তিরমিযির, আলবানী ‘সহিহুত তিরমিযি’ গ্রন্থে (৬০৫) হাদিসটিকে সহিহ আখ্যায়িত করেছেন]

এ দিনগুলোর নেক আমলের মধ্যে রয়েছে- তাকবীর (আল্লাহু আকবার) ও তাহলীল (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ) উচ্চারণ করে আল্লাহর যিকির করা। দলিল হচ্ছে নিম্নরূপ:

১। আল্লাহ তাআলা বলেন: “যাতে তারা তাদের কল্যাণের স্থানগুলোতে উপস্থিত হতে পারে। এবং নির্দিষ্ট দিনগুলোতে আল্লাহ্‌র নাম স্মরণ করতে পারে”[সূরা হজ্জ, আয়াত: ২৮] ‘নির্দিষ্ট দিনগুলো’ হচ্ছে- যিলহজ্জের দশদিন।

২। আল্লাহ তাআলা বলেন: “আর নির্দিষ্ট কয়েকটি দিনে আল্লাহকে স্মরণ কর…”[সূরা বাকারা, আয়াত: ২০৩] এগুলো হচ্ছে- তাশরিকের দিন।

৩। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী: “তাশরিকের দিনগুলো হচ্ছে- পানাহার ও আল্লাহকে স্মরণ করার দিন”[সহিহ মুসলিম (১১৪১)]

দুই: তাকবীর দেয়ার পদ্ধতি

আলেমগণ তাকবীর দেয়ার পদ্ধতি নিয়ে কয়েকটি মত পেশ করেছেন:

১. আল্লাহু আকবার.. আল্লাহু আকবার.. লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, আল্লাহু আকবার.. আল্লাহু আকবার..ওয়া লিল্লাহিল হামদ (অর্থ- আল্লাহ মহান..আল্লাহ মহান..আল্লাহ ছাড়া সত্য কোন উপাস্য নেই..আল্লাহ মহান..আল্লাহ মহান..সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য)।

২. আল্লাহু আকবার.. আল্লাহু আকবার.. আল্লাহু আকবার.. লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, আল্লাহু আকবার.. আল্লাহু আকবার.. আল্লাহু আকবার..ওয়া লিল্লাহিল হামদ (অর্থ- আল্লাহ মহান..আল্লাহ মহান..আল্লাহ মহান..আল্লাহ ছাড়া সত্য কোন উপাস্য নেই..আল্লাহ মহান..আল্লাহ মহান..আল্লাহ মহান..সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য)।

৩. আল্লাহু আকবার.. আল্লাহু আকবার.. আল্লাহু আকবার.. লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, আল্লাহু আকবার.. আল্লাহু আকবার.. ওয়া লিল্লাহিল হামদ (অর্থ- আল্লাহ মহান..আল্লাহ মহান..আল্লাহ মহান..আল্লাহ ছাড়া সত্য কোন উপাস্য নেই..আল্লাহ মহান..আল্লাহ মহান..সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য)।

যেহেতু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে তাকবীর দেয়ার সুনির্দিষ্ট কোন ভাষা বর্ণিত হয়নি তাই এ ক্ষেত্রে প্রশস্ততা রয়েছে।

তিন: তাকবীর দেয়ার সময়

তাকবীর দুই প্রকার:

১। সাধারণ তাকবীর: যে তাকবীর কোন সময়ের সাথে সম্পৃক্ত নয়। এ তাকবীর সবসময় দেয়া সুন্নত: সকাল-সন্ধ্যায়, প্রত্যেক নামাযের আগে ও পরে, সর্বাবস্থায়।

২। বিশেষ তাকবীর: যে তাকবীর নামাযের পরের সময়ের সাথে সম্পৃক্ত।

সাধারণ তাকবীর যিলহজ্জ মাসের দশদিন ও তাশরিকের দিনগুলোর যে কোন সময়ে উচ্চারণ করা সুন্নত। এ তাকবীরের সময়কাল শুরু হয় যিলহজ্জ মাসের প্রথম থেকে (অর্থাৎ যিলক্বদ মাসের সর্বশেষ দিনের সূর্যাস্তের পর থেকে) তাশরিকের সর্বশেষ দিনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত (অর্থাৎ ১৩ ই যিলহজ্জের সূর্যাস্ত যাওয়া পর্যন্ত)।

আর বিশেষ তাকবীর দেয়া শুরু হয় আরাফার দিনের ফজর থেকে তাশরিকের সর্বশেষ দিনের সূর্যাস্ত যাওয়া পর্যন্ত (এর সাথে সাধারণ তাকবীর তো থাকবেই)। ফরয নামাযের সালাম ফেরানোর পর তিনবার ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ পড়বে, এরপর ‘আল্লাহুম্মা আনতাস সালাম, ওয়া মিনকাস সালাম, তাবারাকতা ইয়া যাল জালালি ওয়াল ইকরাম’ বলবে, এরপর তাকবীর দিবে।

তাকবীরের সময়কালের এ বিধান যিনি হাজী নন তার জন্য প্রযোজ্য। আর হাজীসাহেব কোরবানীর দিন যোহরের সময় থেকে বিশেষ তাকবীর শুরু করবেন।

আল্লাহই ভাল জানেন।

দেখুন মাজমুউ ফাতাওয়া বিন বায (১৩/১৭) ও বিন উছাইমীনের ‘আল-শারহুল মুমতি’ (৫/২২০-২২৪)

প্রশ্ন করতে চান?
আপনার প্রশ্নটি নিম্নে লিখুন অথবা কপি-পেস্ট করুন। অবশ্যই আপনার ই-মেইল এড্রেসটি নির্দিষ্ট ফিল্ড-এ পেস্ট করুন। আমরা ইনশা আল্লাহ একজন অভিজ্ঞ আলেমের নিকট থেকে প্রশ্নটির উত্তর জেনে আপনাকে ই-মেইল করবো এবং প্রয়োজনে এই ওয়েবসাইটে প্রকাশ করবো।